হযরত ওমর (রা.)-এর ঈদ শপিং
ঈদের চাঁদ দেখা যেতে আর মাত্র কয়েক প্রহর বাকি। মদিনার অলিতে-গলিতে খুশির আমেজ, শিশুদের কলকাকলি। বাইরে যখন খুশির আমেজ, খলিফার ঘরে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। তাঁর সহধর্মিণী অনেকক্ষণ ধরে কিছু একটা বলতে চেয়েও ইতস্তত করছেন। অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে স্বামীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। অত্যন্ত কুণ্ঠিত স্বরে বললেন, “ আমাদের জন্য ঈদে নতুন কাপড় না হলেও চলবে,কিন্তু ছোট বাচ্চাটি নতুন কাপড়ের জন্য কাঁদছে। ”
খলিফার বুকটা হাহাকার করে উঠল। যিনি বাইতুল মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) রক্ষক, যার ইশারায় কোটি কোটি দিরহাম ব্যয় হয়, তাঁর নিজের পকেটে তখন একটি নতুন জামা কেনার মতো দিরহাম নেই। তিনি অত্যন্ত ভারী কণ্ঠে বললেন,
"হে আল্লাহর বান্দী! তুমি তো জানো, রাষ্ট্রের কোষাগারে আমার কোনো অধিকার নেই। সাধারণ মানুষের হকের পর যে যৎসামান্য ভাতা আমি পাই, তা দিয়ে তো আমাদের সংসার চলে । এই মুহূর্তে নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য আমার নেই।"
সন্তানের চোখের পানি সহ্য করা কঠিন। খলিফা ভাবলেন, আগামী মাসের বেতন থেকে কিছু টাকা অগ্রিম নিলে হয়তো সমস্যা মিটবে। তিনি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী (কোষাধ্যক্ষ) হযরত আবু ওবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর কাছে একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখলেন:
"আমার সন্তানের ঈদের কাপড়ের জন্য আগামী মাসের বেতন থেকে আমাকে সামান্য কিছু দিরহাম অগ্রিম দেওয়া সম্ভব কি?"
চিঠিটি পড়ে আবু ওবাইদা (রা.)-এর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। যিনি অর্ধ-পৃথিবীর ভাগ্যবিধাতা, তিনি কি না সন্তানের সামান্য একটি জামার জন্য হাত পাতছেন! কিন্তু আবু ওবাইদা ছিলেন হকের অতন্দ্র প্রহরী। তিনি আবেগের বশবর্তী না হয়ে খলিফার কাছে একটি ফিরতি চিঠি পাঠালেন।
বাহক যখন চিঠির উত্তর নিয়ে খলিফার কাছে ফিরলেন, তখন খলিফা আশান্বিত ছিলেন। কিন্তু চিঠির ভাঁজ খুলতেই তাঁর দুই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আবু ওবাইদা (রা.) লিখেছিলেন:
"হে আমিরুল মুমেনীন! অগ্রিম বেতন দেওয়ার আগে আপনার কাছে আমার দুটি বিনীত প্রশ্ন আছে:
১. আপনি কি নিশ্চিত যে আগামী মাস পর্যন্ত আপনি বেঁচে থাকবেন?
২. আপনি বেঁচে থাকলেও মুসলিম উম্মাহ আপনাকে আগামী মাস পর্যন্ত খেলাফতের দায়িত্বে রাখবে—তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
যদি এই দুই বিষয়ে আপনি আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারেন, তবেই আমি অগ্রিম বেতন দিতে পারি।"
চিঠিটি পড়ার পর ওমর (রা.) স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে গিয়ে সেখানে এক গভীর আত্মোপলব্ধি দানা বাঁধল। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তাঁর কান্নার নোনা জলে দাড়ি ভিজে একাকার হয়ে গেল। তিনি দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন এবং দোয়া করলেন: "হে আল্লাহ! আবু ওবাইদার মতো একজন সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভীক মানুষ আমার প্রশাসনে রাখার জন্য তোমার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।"
সেদিন সেই ছোট্ট শিশুটি নতুন জামা পায়নি ঠিকই, কিন্তু বিশ্ববাসী পেয়েছিল এক অনন্য শিক্ষা—যেখানে আমানতদারি আর ইনসাফের কাছে নিজের সন্তান আর আবেগ ছিল তুচ্ছ।
📚 রেফারেন্স
--ইবনুল জাওযি, মানাকিবু আমিরিল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব--